Jun 11, 2007

ভূমিধ্বসের ভূমিকা





শেষ খবর পর্যন্ত মারা গিয়েছে ৮৬(এখন ১০৬) জন। এরকম দুই এবং তিন ডিজিটের গণমৃত্যু আমাদের দেশে নতুন না। তবুও খারাপ লাগে। শুধু বৃষ্টির জলেই মানুষ ভেসে যায় এখনো এই দেশে।

চট্টগ্রামে যে জায়গাগুলোয় দূর্ঘটনা হয়েছে তারমধ্যে কয়েকটা আমার বেশ পরিচিত। কুসুমবাগ/ডেবার পাড়/গরীবউল্লাহ্‌ শাহ্‌র মাজারের ওখানে ভূমিধ্বসের একমেবাদ্বিতীয়ম কারণ হচ্ছে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা। যারা ভূমি আইন নিয়ে কিছু জানেন তারা হয়তো জেনে থাকবেন পাহাড়ে কোন দাগ চলে না। আরএস, পিএস কোন কিছু না। যার দখলে সেই পাহাড়ের মালিক। এই সহজ সূত্র আর মাসলম্যান দুইয়ের মিলনে চট্টগ্রাম বেরাছেড়া। কুসুমবাগের ঐ পাহাড়গুলোর বেশীরভাগেরই মালিক ইস্পাহানী। ওদের ভূ-সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করবার সামর্থ্যে কমবার সাথে সাথে গত বিশ বছরে আগত সব কমিশনার, এলাকার মস্তান, প্রভাবশালী লোকজন যে যার মত কেটেছে পাহাড়।

পাহাড় কেটে কিভাবে জমি বের করা হয় সেটা কেউ দেখেছেন কিনা জানি না। সাধারণত করা হয় কি পাহাড়ের যে কোন একটা ঢালু পাদদেশে হঠাৎ একদিন সকালে দেখবেন একটা ঝুপড়ি মতন। দু-তিনটে রিকশার একটা গ্যারেজ, চা-বিড়ি’র দোকান।

কে খুলেছে ?
এলাকার বড় ভাই।
দুদিন বাদে একটু বাঁশ-টিন দিয়ে ছোট্ট ঘের। পাহাড়ের মালিক বুঝবার আগেই ঐ ঘেরের মধ্যে চলে কোদাল চালনা। পনেরদিনের কিম্বা মাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেল প্লট। পয়েন্ট টু বি নোটেড এটা এখন ফ্লাট ল্যান্ড। পাহাড়ের অংশ না। সুতরাং কেউ একটা আরসিসি পিলার গেঁথে দিয়ে দখল নিলেই সেটা তার প্লট। পাহাড়ের যেহেতু কোনো দাগ-খতিয়ান নেই, সুতরাং দাবী করার উপায় নেই এইটা এই পাহাড়ের অংশ।

এলাকার মাস্তানেরা এইভাবে প্লট তৈরি করে এবং লোকজনের কাছে বিক্রী করে। আবার সেই প্লট যারা কিনছে তারা তৎক্ষণাৎ দখল না নিলে আরেক মাস্তান সেটা দখল করবে। সুতরাং আবার নতুন ব্যবসা। প্লট উদ্ধার করে দেওয়ার ব্যবসা।

এই যে প্লট বানানো হয়, এটা পাহাড়ের কোল কেটে বা বলা যায় পাহাড়ের পায়ের কাছে খুঁচিয়ে একটু জায়গা বের করা হয়। তার মানে ঐ প্লটের পিছনে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়। এভাবেই পাহাড় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে প্লট যত বাড়ানো হয়, পেছনের খাড়া দেয়াল তত খাড়া হতে থাকে।

কুসুমবাগের পাহাড়(টিলা বলাই শ্রেয়) মূলত বালিমাটির। চট্টগ্রামে সব পাহাড়ের মাটিতে বালির ভাগ বেশী। এই বালির পরিমাণ ৭০ শতাংশের বেশীই হবে আমার অনুমানে। ফলে একটু মুষলধারে বৃষ্টি হলেই পাহাড় থেকে ঝরে পড়তে থাকে বালি। এই বালি যায় ড্রেনে। ড্রেন বন্ধ করে দেয় নিমিষের মধ্যেই। ফলে জল্যাবদ্ধতা। এই জলাবদ্ধতা যতখানি ড্রেনেজ সিস্টেমের দূর্বলতার জন্য ততখানিই পাহাড়ের ঢাল কেটে ফেলার, কারণে আগত বালির জন্য।

এই পাহাড়ধ্বসে মৃত্যু অনেক পুরোনো ঘটনা। নতুন কিছু নেই এতে। তারপরেও আজ খারাপ লাগলো। ভাবলাম আমি কি বড় বেশী আঞ্চলিকতায় ভুগি। অন্য একটা দেশে থেকে আজ দেশের জন্য উদাস হয় মন, আরেকদিন খারাপ হয় দূরের একটা শহরের জন্য। দেশে থাকলে হয়তো কোন বন্ধুর বাসায়, কিম্বা আর্ট কলেজের সামনে কোন এক বন্ধুর সাথে তুমুল তর্ক-আলোচনায় মেতে উঠতাম কেন হয় এরকম, কি করা উচিত এসব নিয়ে। আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যেত মন খারাপের মেঘ। রাতে বাসায় খেয়ে দিতাম একটা ঘুম। এখন একদলা প্যাঁপ্যাঁচে মনখারাপ নিয়ে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড খুলে বসি।

এই লেখার শেষে এসেও ভাবছিলাম এরকম ‘বন্ধু তুমি রঙ্গুম গেলা’ টাইপ ম্যাদারুস আবেগের কিছু আর লিখব না। এগুলো সম্ভবত না বলা কথা, শব্দের আকার নিচ্ছে।

1 comment:

ইরতেজা said...

ভালো লিখেছেন। আমিও একটা ব্লগ লিখেছি চট্টগ্রামের ভূমিধ্বসের উপর দেখবেন সময় পেলে।
আপনাকে ধন্যবাদ